[smartslider3 slider=”9″]

তিনি নিজে নায়ক ছবির শুটিং দেখেছেন, সেই স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায়।বাবা যখন ‘নায়ক’ ছবিটা করেন, আমি স্কুলে পড়ি। সেই প্রথম বাবা কাজ করেছিলেন উত্তমকুমারকে নিয়ে।’নায়ক’- এর শুটিং করার আগে বাবা প্রি-প্রোডাকশনের কাজ করেছিলেন অনেকদিন ধরেই। ছবিটার বেশিরভাগ ঘটনাই ট্রেনে।’নায়ক’ যেহেতু ট্রেনের প্রচুর দৃশ্য তাই ব্যাক প্রজেকশনেরও প্রচুর ব্যবহার ছিল ছবিটিতে।

উত্তমবাবুর সঙ্গে কাজ করেও বাবা খুব আনন্দ পেয়েছিলেন। উত্তমবাবু অভিনয়ের ব্যাপারে বাবার নির্দেশ তো শুনতেনই, উপরন্তু নিজেও অনেক ভাবনা চিন্তা করেছিলেন। বাবা এর আগে উত্তমবাবুর প্রচুর ছবি দেখেছিলেন। আলাপও ছিল। ফলে তাঁর ম্যানারিজম, উচ্চারণ খুব ভালভাবে লক্ষ্য করেছিলেন। সেই জন্যই মনে হয়, সংলাপ বলতে উত্তমবাবুর কোনও সমস্যা হয়নি। তিনি শুটিংয়ের সময় একবার বাবাকে বলেওছিলেন, “মানিকদা, আমার কিন্তু আপনার চিত্রনাট্যের ডায়লগ মুখস্ত করতে হয়নি। ওটা অটোমেটিক্যালি চলে এসেছে। মনে হচ্ছে, আমি নিজেই কথা বলছি।”

অভিনেতা হিসেবে উত্তমবাবু ছিলেন খুবই পেশাদার। কিন্তু ব্যবহার আন্তরিক। বাবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। আর অভিনয়? ‘নায়ক’- এর বেশিরভাগ দৃশ্যই এক টেকে তোলা। রিটেক করার বিশেষ প্রয়োজন হয়নি। প্রথম টেকেই ওকে হয়ে যেত। নায়ক- এর শুটিংয়ের পরিবেশও ছিল চমৎকার। উত্তমবাবুর মধ্যে একটা বিশেষ ব্যাপার লক্ষ করেছিলাম। অনেক অভিনেতাই শুটিংয়ের সময় বাইরের লোক বিশেষ পছন্দ করেন না। বিশেষত রোমান্টিক দৃশ্যে তো একেবারেই নয়। মনঃসংযোগের অসুবিধে হয় তাঁদের। কিন্তু উত্তমবাবু ছিলেন একেবারে উল্টো। প্রথম জীবনে নাটক করতেন নিয়মিত। বোধহয় সেই অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। ফলে সেটে যত লোক থাকত, আর সেই লোকজন যদি তাঁর অন্ধভক্ত হতেন,তাহলে উত্তমবাবুর অভিনয় আরও খুলত। আমার মাসি -পিসিরা ছিলেন উত্তমকুমার বলতে অজ্ঞান। কাজেই তাঁরা খুব ঘন-ঘন ‘নায়ক’-এরশুটিং দেখতে যেতেন। আর তার প্রভাব পড়ত অভিনয়ে। বিশেষত একটা দৃশ্যের শুটিং তোএখনও চোখে ভাসে। ওই যেখানে অরিন্দম টেবিল চাপড়ে বলছে, “আই উইল গো টু দ্য টপ,দ্য টপ….”.

সামনে থেকে দেখেছিলাম, কী অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন উত্তমবাবু! ‘নায়ক’ নিয়ে প্রচুর স্মৃতি।এনটি ওয়ান স্টুডিওতে ওই টাকায় তলিয়ে যাবার দৃশ্যের শুটিং হবে। বিশাল সেট পড়েছে। প্রচুর টাকা ছাপানো হয়েছে। সেই ছাপানো টাকা দিয়ে সেট ভরানো হয়েছে। ওই সেটের পাশেই ছিল উত্তমবাবুর মেকআপ রুম। সেট প্রস্তুত হওয়ার পর বাবা একজন সহকারী পরিচালককে বলেছিলেন, “একবার উত্তমকে ডাকো। সেটটা দেখাই।”উত্তমবাবু তো সেটে ঢুকেই হতবাক। চারদিকে রাশি- রাশি টাকা ছড়িয়ে। সেই ছড়ানো টাকার দিকে তাকিয়ে উত্তমবাবু প্রথমেই বললেন, “কী থ্রিলিং লাগছে মানিকদা”. তবে ‘নায়ক’- এর শুটিংয়ের গোড়ার দিকের একটা ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনার জন্য উত্তমবাবু ঠিক প্রস্তুত ছিলেন না। ছবির প্রথম দিকের কাজ হয় আলিপুরের এক বাড়িতে।সেখানে অরিন্দমের বাড়ির সেট পড়েছিল। ওই বাড়ির একটা ঘর ঠিক করা হয়েছিল উত্তমবাবু এবং অন্য শিল্পীদের মেকআপের জন্য।বাবা মেকআপ আর্টিস্ট অনন্ত দাসকে বলেছিলেন, “উত্তম এলে বলো, ওর কোনও মেকআপ হবে না। আমি কোনও মেকআপ চাই না।” অনন্তকাকু তো মাথা নেড়ে চলে গেলেন।তারপর সুব্রত মিত্র লাইটিং করছেন। এমন সময় অনন্তকাকু এসে আমতা আমতা করে বললেন,”মানিকদা, উত্তমবাবু এসেছেন।এবং উনি মেকআপ চেয়ারে বসে পড়েছেন।”বাবা বললেন,”তোমায় যে বললাম, উত্তমকে বলতে ওর মেকআপ হবে না।”অনন্তকাকু একই ভাবে বললেন,”মানিকদা আমি বলতে ঠিক সাহস পাচ্ছি না। এটা তো এমন একটা অভ্যাসের ব্যাপার…”বাবা তখন নিজেই গেলেন মেকআপ রুমে।বললেন,”উত্তম, তোমার কোন মেকআপ হবে না।”. এটা শুনে উত্তমবাবু খুব ধাক্কা খেয়েছিলেন।এর কিছুদিন আগেই তিনি জলবসন্ত থেকে উঠেছিলেন। মুখে একটা দুটো দাগ ছিল। সেই কারণে তিনি ঘাবড়ে গিয়েছিলেন।বাবা বুঝিয়েছিলেন, “তোমার কোনও চিন্তা নেই।ফ্ল্যাশব্যাক তো আছে। তাতে একটু মেকআপ হবে। কিন্তু এমনিতে কোনও মেকআপ দেব না।যদি ঘাম হওয়ার বা গরমে প্রবলেম হয় তাহলে জাস্ট প্যাড করে দেব। আর কিছু হবে না।”এটা উত্তমবাবু চট করে মেনে নিতে পারেন নি।বাবা আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “তোমার যদি মনে হয়, তাহলে আমি তোমার রাশ দেখাতে পারি।তোমার যদি রাশপ্রিন্টে নিজেকে খারাপ লাগে, তাহলে দেখি কী করতে পারি। তখন ভাবনা চিন্তা করব।”কিন্তু রাশ দেখে উত্তমবাবু খুশি হয়েছিলেন।বলেছিলেন, “তা হলে আমি এত মেকআপ করি কেন?”‘নায়ক’ মানেই তো উত্তমবাবু। আর উত্তমবাবুর কিছু- কিছু কাজ এখনও চোখে ভাসে।অভিনয়ের ব্যাপারে মানুষটা ছিলেন খুব সিরিয়াস।ক্যামেরা চালু হলে একেবারে অন্যরকম ব্যক্তিত্ব।সবচেয়ে বড় কথা, ছবির চিত্রনাট্য তিনি মন দিয়েপড়েছিলেন। ছবির সংলাপগুলো যে অত স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলতে পেরেছেন, তার পিছনে ছিল নিরলস হোমওয়ার্ক।

দু’একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে ব্যাপারটা।’নায়কে’-এর সেই দৃশ্য মনে আছে? যেখানে শঙ্করদা মারা গিয়েছিলেন বিজয়া দশমীর দিনে।তারপর তো শংকরদার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কাঁধে চাপিয়ে। সেই দৃশ্য তোলা হয়েছিল এনটি ওয়ানে। সেখানে শট শুরুর ঠিক আগে উত্তমবাবু বাবা কে বলেছিলেন, “মানিকদা, ঠিক পাঁচ মিনিট। আপনি রেডি হয়ে যান। আমি এসেই কিন্তু শটটা দেব।”. বাবা প্রস্তুত হলেন। ক্যামেরা, লাইট রেডি।উত্তমবাবুকে দেখলাম যে দূরে অন্ধকারে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। পাঁচ মিনিট বাদে ফিরলেন, চোখে জল। মানে গ্লিসারিনের কোনও প্রয়োজন হয়নি।আর উত্তমবাবুর ক্রেজ? খন্যানের সেই শুটিংয়ের কথা মনে পড়ে? দৃশ্যটা ছিল ট্রেনখন্যানে থেমেছে। উত্তমবাবু নেমেছেন। এক চাওয়ালার কাছ থেকে চা কিনে খেতে গিয়েশর্মিলাদির সঙ্গে চোখাচোখি হয়। উত্তমবাবু চায়ের ভাঁড় উঁচু করে শর্মিলাদিকে ইশারা করেন। আর শর্মিলাদি হাতের কাঁটা চামচ দেখান। মানে তিনি চা খাবেন না, দুপুরের খাবার খাচ্ছেন।

তো ছবির এই দৃশ্যের যে অংশ খন্যানে শুটিং হয়েছিল, সেখানে তো কোন ট্রেন ছিল না।শর্মিলাদির থাকার প্রশ্নই নেই। সেই শট তো স্টুডিওয় তোলা হয়। ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে উত্তমবাবু চায়ের ভাঁড় তুলে শটটা দেবেন। শুটিংয়ের সময় একদিকের প্ল্যাটফর্মে উত্তমবাবু দাঁড়িয়েছিলেন শট দেবেন বলে। অন্য প্ল্যাটফর্মে হাজার- হাজার মানুষ। উত্তমবাবু যেই চায়ের ভাঁড় তুলেছেন,অমনি উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মের জনতা প্রায় হামলে পড়ল, “গুরু আমি, গুরু আমি খাব।”

আনন্দলোক পত্রিকা থেকে সংগৃহীত।

Added by

admin

SHARE

Your email address will not be published.